বিভীষিকার ১২ বছর : বিচার নেই : আছে গ্রেনেড

প্রকাশিত: ১০:৫৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০১৬

বিশেষ প্রতিনিধি  :: ২০০৪ থেকে ২০১৬। সময়ের ব্যবধান এক যুগ। এক যুগে অনেককিছুই পাল্টে যায়। মানুষ থেকে পরিবেশ। সময় থেকে মানচিত্র। সবই পাল্টিয়েছে। কেবল পাল্টায়নি বিভীষিকার চিত্র। সিলেট থেকে ঢাকা। গুলশান সেন্টার থেকে হলি আর্টিজন। বিভীষিকার চিত্র একই। বছর ঘুরে ঘুরে শুধু নতুন দুঃস্বপ্ন ছড়ায় প্রলয়ংকারী গ্রেনেড।  ৭ আগস্ট। এক বিভীষিকার দিন। বছর ঘুরে ক্যালেন্ডারের এই দিনকে ঘিরে এখনো আঁতকে উঠেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ১২ বছর আগের এই ঘোমট স্মৃতি এখনো দুঃস্বপ্ন সিলেট আওয়ামী লীগের অনেক নেতাদের কাছে। ২০০৪ সালের এই দিনে তালতলাস্থ গুলশান সেন্টারে চলছিল সিলেট নগর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভা। সন্ধ্যার পর ওই সভা শেষে সেখানে অতর্কিত গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। মুহুর্মূহু বিস্ফোরণে কেঁপে উঠে গুলশান সেন্টারের আশপাশ এলাকা। এবড়োথেবড়োভাবে পড়ে থাকে নেতাদের দেহ। কিছু বুঝে উঠার আগেই নিহত হন তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ইব্রাহিম আলী। আহত হন আরো প্রায় মহানগর কমিটির বিভিন্ন পদে থাকা ২৫ নেতা। তাঁদের সবার শরীরে এখনো স্পিøন্টারের ক্ষতচিহ্ন। এই ঘটনার পরদিন ২০০৪ সালের ৮ আগস্ট সিলেট কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. এনামুল হক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। ১২ বছর ধরে এই মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। শাস্তি হয়নি প্রকৃত অপরাধীদের। বিচার থমকে থাকলেও থেমে নেই গ্রেনেড। ৭ আগস্ট সিলেট থেকে ২১ আগস্ট ঢাকাÑ এভাবে বারবার ফিরে ফিরে আসছে বিভীষিকা। সময়ে সময়ে দেশকে অশান্ত করে জয়ধ্বনি তুলছে অশুভ শক্তি। যার নির্মম পরিণতি গুলশান হলি আর্টিজন কিংবা শোলাকিয়ার ময়দান। গুলশান সেন্টারের এই হামলা নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) জঙ্গিরা করেছে বলে আদালতে তারা স্বীকারোক্তি দেয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২০০৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। এতে মুফতি আবদুল হান্নান ও শরিফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুলসহ আট জঙ্গিকে অভিযুক্ত করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই হামলায় আহত আওয়ামী লীগ নেতা মিসবাহউদ্দিন সিলেটের সরকারি কৌঁসুলি নিযুক্ত হন। আদালতে মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে তিনি ২০১০ সালের ২ আগস্ট ঘটনার পুনঃতদন্তের আবেদন করেন। গ্রেনেড হামলার মদদদাতা ও গ্রেনেডের উৎস বের করতে ওই আবেদনের পর অধিকতর তদন্ত শেষে সিআইডি সিলেট অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার রওনকুল হক চৌধুরী প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে নতুন করে অভিযুক্ত করা হয় আরও দুজনকে। তারা হলো তাজ উদ্দিন ও ‘কাশ্মীরি জঙ্গি’ আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট। সিলেটের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি শামসুল ইসলাম বলেন, মহানগর দায়রা জজ আদালতে দুটি মামলার মধ্যে বিস্ফোরক মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। আর হত্যা মামলাটিতে অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। বিচার বিলম্বিত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মামলার সব আসামি দেশে অন্যান্য জঙ্গি হামলার মামলার আসামি। একই দিন একাধিক আদালতে মামলার তারিখ থাকায় বিচার-প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। এদিকে, গুলশান সেন্টারে হামলার এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে শনিবার দুপুরে সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন সিলেট আওয়ামী লীগ নেতারা। এ সময় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেটে ঘটে যাওয়া গ্রেনেড ও বোমা হামলায় জড়িত কেউই রেহাই পাবে না। ২০০৪ সালের ৭ আগস্ট গুলশান সেন্টারে আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ ওই হামলা চালায়। এর পেছনে মদদদাতা ছিল তারেক-হারিছরা। ওই হামলায় নিহত হওয়া মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রচার সম্পাদক ইব্রাহিম আলীর আত্মার শান্তি কামনা করে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, ‘হামলায় আওয়ামী লীগের ২০ জন নেতাকর্মী আহত হন। তাদের অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না।’ তিনি আরো বলেন, ‘কারা জঙ্গি গোষ্ঠী সৃষ্টি করছে, কারা তাদের মদদ দিচ্ছে, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। দেশে বিএনপি-জামায়াতের মদদে, আশির্বাদপুষ্ট হয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করতেই একের পর এক জঙ্গি হামলা হচ্ছে।’ চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেশে বিভিন্ন জঙ্গি হামলার ঘটনার বিবরণ দিয়ে মিসবাহ সিরাজ বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের মদদেই এসব ঘটেছে। বিএনপি-জামায়াত জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন ‘রোলমডেল’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন পাকিস্তানের দোসর বিএনপি-জামায়াত ঈর্ষান্বিত হয়ে দেশকে অস্থিতিশীল অকার্যকর রাষ্ট্র করতে তৎপর।’ বিএনপি-জামায়াতের আমলে বিভিন্ন স্থানে গ্রেনেড ও বোমা হামলার ঘটনা ‘ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা করা হয়েছিল’ মন্তব্য করে মিসবাহ সিরাজ বলেন, ‘এখন তা অতীত। সব ঘটনার বিচার হবে। সিলেটে সকল জঙ্গি হামলার বিচার হবে। জঙ্গিদের মূলোৎপাটন করা হবে। এজন্য প্রয়োজন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য।’ এসময় অন্যানের মধ্যে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক লুৎফুর রহমান, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •