একসাথে সমাহিত তিন বন্ধু, শোকে স্তব্ধ গোয়াইনঘাট

sylhetsurma.com
প্রকাশিত জুলাই ৬, ২০২৬
একসাথে সমাহিত তিন বন্ধু, শোকে স্তব্ধ গোয়াইনঘাট

Manual4 Ad Code

কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা ছিল একই বেঞ্চের সহপাঠী, একই স্বপ্নের পথযাত্রী। একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছে, গল্প-আড্ডায় মেতেছে। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই তিন বন্ধুকেই বিদায় নিতে হলো একসঙ্গে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী সাকিব আহমদ (১৬), রায়হান আহমেদ (রাহুল) (১৬) ও জয় আহমদ (১৬)-এর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তাদের অকাল মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো গোয়াইনঘাট।

সোমবার একসাথে তিন বন্ধুরজোনাযার নামাজ শেষে তাদের দাফন করা হয়।

রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে চলমান পরিক্ষা শেষ বেড়াতে গিয়ে উপজেলার মধ্যে জাফলং ইউনিয়নের রাধানগর-বাউরভাগ চা বাগান সড়কে তাদের বহনকারী একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। গুরুতর আহত তিন শিক্ষার্থী চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে মারা যায়।

নিহতরা হলো- উপজেলার নয়াবস্তি গ্রামের মহরম মিয়ার ছেলে সাকিব, ছৈলাখেল গ্রামের হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়ার ছেলে রায়হান এবং লাখেরপাড় গ্রামের আব্দুল রাজ্জাক মিয়ার ছেলে জয়। পৃথক জানাজা শেষে তাদের নিজ নিজ সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

Manual8 Ad Code

সোমবার নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উঠোনজুড়ে স্বজনদের কান্না, আর ঘরের ভেতরে সন্তানহারা মায়েদের আহাজারিতে যেন বাতাসও ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ ছেলের স্কুলব্যাগ বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন, কেউ বারবার ডেকে বলছেন, একবার ফিরে আয় বাবা, আরেকবার মাকে ডেকে যা। এক মায়ের আর্তনাদ, সকালে হাসিমুখে পরীক্ষা দিতে গেল, সন্ধ্যায় আমার বুক খালি করে ফিরে এলো। আরেক মা ছেলের ছবি বুকে চেপে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। সেই কান্নায় উপস্থিত অনেকের চোখও অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই তিন বন্ধুর মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। স্কুল, খেলাধুলা কিংবা অবসরের প্রতিটি মুহূর্তে তারা ছিলেন একে অপরের ছায়াসঙ্গী। এখন তারা পাশাপাশি কবরের নীরব বাসিন্দা।

Manual3 Ad Code

সাকিবের বাবা মহরম মিয়া বলেন, ‘আমার ছেলে খুব শান্ত-স্বভাবের ছিল। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। আল্লাহ আমার বুকটাই খালি করে দিলেন। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ যে কত ভারী, তা যার সন্তান হারিয়েছে, সেই শুধু বুঝবে।’

Manual7 Ad Code

রায়হানের বাবা হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়া বলেন, ‘সাকিবের মৃত্যুর খবরেই আমরা ভেঙে পড়েছিলাম। তখনও আশা ছিল আমার ছেলেটা হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই আশাটাও শেষ হয়ে গেল। সকালে পরীক্ষা দিতে বের হওয়া ছেলেটা আর জীবিত ফিরল না।’

জয়ের বাবা রাজ্জাক মিয়া বলেন, ‘তিন বন্ধু সব সময় একসঙ্গে চলাফেরা করত। কখনো ভাবিনি, আল্লাহ ওদেরও একসঙ্গে নিয়ে যাবেন। এখন তিনটি পরিবার একই শোক বয়ে বেড়াচ্ছে।’

এ ঘটনায় জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা একে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সহপাঠীদের মধ্যে নূর হোসেনসহ অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এক বেঞ্চের তিন বন্ধু এভাবে চলে যাবে, আমরা কখনো ভাবিনি।

তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন ৩ নম্বর পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্যরা। তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সবাইকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

Manual1 Ad Code

এদিকে এ মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা- সমালোচনা শুরু হয়েছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী এ ঘটনাকে অপূরনীয় ক্ষতি আখ্যা দিয়ে বলেন, এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো, লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা যাতে মোটরসাইকেল নিয়ে স্কুলে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।