২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলংকজনক দিন। সেইদিন দেশি-বিদেশি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ধারক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় নোবেলজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসকে। তিনি অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিলেন সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ। এর সুযোগ নেয় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, বিএনপি-জামায়াতসহ নানা সমমনা গোষ্ঠী। এক বছর হতে চলেছে, অথচ দেশের আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও প্রশাসন কোনো খাতে স্থিতিশীলতা আসেনি; বরং দেশ ক্রমেই অস্থিরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত দেড় দশকে বাংলাদেশ এক সোনালী অধ্যায় অতিক্রম করেছিল। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, ডিজিটাল বাংলাদেশ-এসব কীর্তি প্রমাণ করেছিল সঠিক নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে অপ্রতিরোধ্য। দারিদ্র্য হ্রাস, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি-সবই দেশকে দিয়েছে নতুন গতি। আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশ সম্মান অর্জন করেছিল।
কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা অনেকের কাছে ছিল গাত্রদাহের কারণ। পাকিস্তানপন্থী চক্র, বিএনপি-জামায়াত, বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল এবং কিছু দেশি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক রাজনীতিকে ধ্বংস করা এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় এমন শক্তিকে বসানো, যারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
ডক্টর ইউনুস দায়িত্ব নেওয়ার পর গঠন করেন তথাকথিত “জাতীয় নাগরিক পার্টি।” এই দলে স্থান পায় জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সংগঠন। এর ফলে আবারও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তি। রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় তারা শুরু করে ভয়ঙ্কর মব কালচার। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে চাঁদাবাজি, খুন, দখলবাজি, সন্ত্রাস। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে।
আজকের বাংলাদেশে মানুষের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক এই মব কালচার। ব্যবসায়ী নিরাপত্তাহীনতায়, শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায়, কৃষক উৎপাদিত ফসল ঠিকমতো বাজারজাত করতে পারছে না। প্রশাসনের ব্যর্থতা স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের মধ্যে শেখ হাসিনার শাসনকালকে স্মরণ করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
অন্যদিকে বিএনপি সমর্থকেরা সুযোগ পেয়েই আবারও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির পথে হাঁটছে। টায়ার পুড়ানো, ভাঙচুর, সন্ত্রাসী তৎপরতা- সবকিছু যেন ২০১৩-১৪ সালের অগ্নিসন্ত্রাসের দৃশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছে। জামায়াতও আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্ন আজ উপেক্ষিত, বরং তাদের মুক্তির দাবিতে মিছিল হচ্ছে প্রকাশ্যে। এ যেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির পুনরুত্থান।
এক বছরের মাথায় দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার পথে। বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির, রপ্তানি খাত সংকটে, ব্যাংকিং সেক্টরে অস্থিরতা। জনগণের আস্থা হারিয়েছে বর্তমান প্রশাসন। অথচ আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীর উপর চলছে দমন-পীড়ন। কারাগার ভরে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষেরা দিয়ে, বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছে মুক্তিকামী শক্তি।
ষড়যন্ত্রকারীরা ভেবেছিল শেখ হাসিনাকে সরালে দেশে গণতন্ত্র ও অগ্রগতি আসবে। বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। আজ জনগণ বুঝতে পারছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বই ছিল উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার একমাত্র ভরসা। তাঁর পতনের পরই প্রমাণ হলো, আওয়ামী লীগকে সরানো মানে দেশকে অরাজকতায় ঠেলে দেওয়া।
বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্র সবসময় চেষ্টা করেছে স্বাধীনতার চেতনা ধ্বংস করতে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বিএনপি-জামায়াতের শাসনকাল পর্যন্ত তাদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে তারা স্তব্ধ হয়ে ছিল। কিন্তু আজ আবার রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায় তারা সক্রিয়। জাতীয় নাগরিক পার্টি নামের নতুন ছদ্মবেশে তারা বাংলাদেশকে বিপদে ফেলেছে। এখন মুক্তিকামী মানুষকে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায়, উন্নয়ন-অগ্রগতি ফিরিয়ে আনতে আবারও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দরকার। আন্তর্জাতিক মহলকেও জানাতে হবে- ৫ আগস্টের সরকার পতন কোনো স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি এক গভীর ষড়যন্ত্র, যার ফল ভোগ করছে সমগ্র জাতি।
আজকের বাংলাদেশে যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা শেখ হাসিনার পতনের সরাসরি ফলাফল। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দল আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতাচ্যুত করে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর দায় ইতিহাস কখনো ক্ষমা করবে না।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে তাই এখন নতুনভাবে সংগঠিত হতে হবে। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে এনে বাংলাদেশকে আবারও মুক্তির পথে, উন্নয়নের পথে ফিরিয়ে নিতে হবে। সেই নেতৃত্বে একমাত্র বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা- এটাই আজকের বাস্তব সত্য।
লেখক :
আহবায়ক : বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
জাউয়াবাজার ইউনিয়ন শাখা, ছাতক, সুনামগঞ্জ।