স্টাফ রিপোর্টার :
সিলেটের গোলাপগঞ্জের এক সুপরিচিত ব্যবসায়ী পরিবার দীর্ঘদিন ধরে হুমকি, হামলা, চাঁদাবাজি ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস তার পরিবারের উপর ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে গণমাধ্যমের কাছে বিচার দাবি করেছেন।
আব্দুল কুদ্দুস (১৭ মে ২০২৫) সাংবাদিকদের বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ‘শাহীন অটো ট্রেডার্স’ এবং ‘শাহীন স্যানিটারি হাউস’পরিচালনা করে আসছিলাম। আমার ব্যবসা কেবল আর্থিকভাবে সফলই ছিল না, বরং স্থানীয়ভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। ব্যবসায় ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতো আমার ছোট ভাই ইদন মিয়া। সে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তার সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড আমাদের ব্যবসার উপর প্রভাব ফেলছিল। এক পর্যায়ে মাদক বিক্রির সময় তাকে হাতেনাতে ধরায় চাকরি থেকে বের করে দেই।”
তিনি আরও বলেন, “এরপর আমার ছেলে মুন্তাহার হোসেন শাহীনকে ব্যবসার দায়িত্ব দিয়ে আমি নিজে ব্যবসা থেকে অবসর নিয়েছিলাম।”
আব্দুল কুদ্দুস উল্লেখ করেন, “আমার ছেলে মুন্তাহার হোসেন শাহীন ছাত্রজীবনে মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন সামাজিক প্রচারণায় সক্রিয় ছিল। এই কারণে আমার ভাই ইদন মিয়ার সঙ্গে তার (ছেলের) বিরোধের উদ্ভব ঘটে। চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা তাকে আরও ক্ষুব্ধ করে, ফলে সে আমার ছেলের সঙ্গে শত্রুতা শুরু করে।”
কুদ্দুস অভিযোগ করে বলেন, ‘‘আমার ভাই ইদন মিয়া শাহীনকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে নাই। ২০২৩ সালের ১ আগস্ট, সে দলীয় সন্ত্রাসী লোকজন পাঠিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। তারা নিজেদের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ক্যাডার বলে পরিচয় দেয় এবং পরিণতি ভালো হবে না বলেও শাহীনকে সাসিয়ে যায়।’’
‘‘শাহিন বিষয়টি গুরুত্ব না দেওয়ায় ২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ইদন মিয়া নিজে আওয়ামী লীগের ক্যাডার নিয়ে আবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসে এবং প্রকাশ্যে ব্যবসা দখলের ইচ্ছা ব্যক্ত করে। শাহীন তার দাবি প্রত্যাখ্যান করলে ক্ষুব্ধ হয়ে ইদন মিয়া জোরপূর্বক ব্যবসা দখল নেওয়ার হুমকি দেয়। ওইদিন রাতে বাড়ি ফেরার পথে শাহীনের উপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। হামলায় শাহীন গুরুতর আহত হয়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।’’
কুদ্দুস আরও বলেন, ‘‘এ ঘটনার পর ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে আমি শাহিনকে নিয়ে স্থানীয় থানায় হত্যা চেষ্টার অভিযোগ দায়ের করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। পুলিশের দাবি, অভিযুক্তের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কার্যকর পদক্ষেপ মামলা নেওয়া যাবে না। পরবর্তীতে আমার ছেলে শাহীনের নিরাপত্তার অভাব দেখা দেওয়ায় বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করে এবং পরে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকায় কানাডা চলে যায়।’’
আব্দুল কুদ্দুস আরও অভিযোগ করে বলেন, ‘‘আমার ভাই ইদন মিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক আগেই, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে যোগ দেয় এবং নিজেকে একজন জুলাই আন্দোলনকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। পরে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা আছে এই বিশ্বাসে তার দলবলসহ বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেয়। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর তার রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।’’
তিনি (আব্দুল কুদ্দুস) বলেন, ‘‘শাহীন কানাডা যাওয়ার পর, বাধ্য হয়ে ছোট ছেলে শাহরিয়ার হোসেন তুহিনকে নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকি। এরমধ্যে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ইদন মিয়া ও তার সহযোগীরা (বিএনপির ক্যাডার) আবারও আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে। তাদের দাবি, পূর্বে শাহীনের সাথে ৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার সমঝোতা হয়েছিল। এই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে আমার পরিবারকে শায়েস্তা করার হুমকি দেওয়া হয়।’’
‘‘অতপরঃ ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি একদল সশস্ত্র ব্যক্তি আমার বাড়িতে হামলা চালায়। তারা আমার ছেলে শাহীনের অবস্থান জানতে চায় এবং চাঁদার টাকা দাবি করে। তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় আমি সিলেট ট্রমা সেন্টারে ভর্তি হই। যেখানে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিলাম’’, বলেন আব্দুল কুদ্দুস।
তিনি (কুদ্দুস) বলেন, ‘‘হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। বরং অভিযুক্তদের সাথে আপোষ করার পরামর্শ দেয়।’’
আব্দুল কুদ্দুস একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে হতাশার সুরে বলেন, ‘‘আমার পরিবার এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে আমার ছেলে শাহীনের জীবন হুমকির মুখে। দেশে ফিরে আসলে আমার ভাইয়ের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আমার ছেলে খুন-গুম হতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে।’’
এ বিষয়ে গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মোল্যা’র বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।