• ২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ৪ঠা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

সিলেটের ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবন: কেউ বানিয়েছে আগুন নেভানো রোবট, কেউ হাঁটার চাপ থেকে বিদ্যুৎ

sylhetsurma.com
প্রকাশিত মে ২১, ২০২৬
সিলেটের ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবন: কেউ বানিয়েছে আগুন নেভানো রোবট, কেউ হাঁটার চাপ থেকে বিদ্যুৎ

Manual3 Ad Code

সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের মোহাম্মদ আলী জিমনেসিয়াম হল যেন পরিণত হয়েছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের উদ্ভাবকদের মিলনমেলায়।

Manual8 Ad Code

এখানেই আয়োজিত হয় ৪৭তম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা। তিন দিনব্যপী এই বিজ্ঞান মেলায় জেলার বাইর থেকেও অংশ নেয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এতে কেউ নিয়ে আসে কৃষি প্রযুক্তি, কেউ দুর্যোগ মোকাবিলা, কেউবা বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থার নতুন ধারণা।

মেলার স্টল ঘুরে দেখা যায়, নিজেদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিগত ধারণা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে শিক্ষার্থীরা। দর্শনার্থীদের সামনে কেউ ব্যাখ্যা করছে রোবটের কাজ, কেউ দেখাচ্ছে বিদ্যুৎ তৈরির পদ্ধতি, আবার কেউ তুলে ধরছে ভবিষ্যতের স্মার্ট গ্রামের পরিকল্পনা।

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের টেংরাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একসাথে নিয়ে এসেছে পাঁচটি ভিন্ন প্রকল্প। দলটির সদস্য নুসরাত জাহান নুপুর জানায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যাকে সামনে রেখেই তারা এসব প্রজেক্ট তৈরি করেছে।

তাদের অন্যতম প্রকল্প ‘আন্ডার ওয়াটার বোট ট্রেকার’। কোনো নৌযান দুর্ঘটনার কবলে পড়লে সেটি সার্ভারের মাধ্যমে সিগনাল পাঠাবে জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দুর্ঘটনার স্থান শনাক্ত করে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে তারা।

এছাড়া কৃষির জন্য তারা তৈরি করেছে ‘স্মার্ট এগ্রো ড্রোন’ ও ‘অটো এরিগেটর’। জমির আর্দ্রতা, পুষ্টি উপাদান, রোগবালাই কিংবা পোকামাকড়ের আক্রমণ শনাক্ত করতে সাহায্য করবে এসব প্রযুক্তি। তাদের দাবি, এতে কৃষকের সময় ও খরচ দুটোই কমবে।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে তারা দেখিয়েছে ‘স্মার্ট ট্রাফিক মনিটরিং সিস্টেম’। সেন্সরের মাধ্যমে গাড়ির চাপ বুঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিগনাল নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য তারা ‘সেলুলয়েড ইঞ্জিন’ নিয়েও কাজ করছে।

শিক্ষার্থীরা জানায়, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন ও সরকারি সহযোগিতা পেলে দেশের জন্য বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

অন্যদিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ভাটারা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীরা নিয়ে এসেছে “উন্নত গ্রামীণ জীবনযাত্রা” বিষয়ক প্রকল্প। ফাতেমা তালুকদার জানায়, শহরের আধুনিক সুবিধাগুলো গ্রামের মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই তারা কাজ করছে। তবে গ্রামের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখেই উন্নয়ন ঘটাতে চায় তারা।

Manual5 Ad Code

হবিগঞ্জের বাহুবলের মিরপুর আলিফ সোবহান চৌধুরী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেছে আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। তারেক আহমেদ তানভীর জানায়, তারা এমন একটি এআইভিত্তিক রোবটিক সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে যা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে বোমা নিষ্ক্রিয় করা, শত্রুপক্ষ শনাক্ত করা কিংবা নেটওয়ার্ক জ্যামিংয়ের মতো কাজ করতে পারবে।

এদিকে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের দুই শিক্ষার্থী শ্রেয়সী অধিকারী ও সুবর্ণা দে কাজ করছে মানুষের হাঁটার চাপকে বিদ্যুতে রূপান্তরের ধারণা নিয়ে। তারা জানায়, বিশেষ ধরনের টাইলসের উপর মানুষ বা যানবাহন চলাচল করলে সেই চাপ মোটরের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হবে।

তাদের মতে, ব্যস্ত সড়ক কিংবা জনসমাগমপূর্ণ স্থানে এটি স্থাপন করা গেলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে।

সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায় সিলেট ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মুশফিকুর রহমান সাঈমের স্টলে। তার ‘ফায়ারফাইট রেসকিউ’ প্রজেক্টে ছিল আগুন নেভানো ও উদ্ধারকাজে সক্ষম বিশেষ রোবট।

Manual8 Ad Code

সে জানায়, কোথাও আগুন লাগলে রোবটটি মানুষের আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুনের ধরন শনাক্ত করতে পারবে। ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের মাধ্যমে আটকে পড়া মানুষের অবস্থান উদ্ধারকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেবে। ভবিষ্যতে এতে ড্রিল প্রযুক্তি ও অক্সিজেন সিলিন্ডার সংযুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

মেলায় আসা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক আগ্রহ। কেউ স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে এসেছে, কেউ এসেছে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে।

সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দিয়া সিনহা জানায়, বিজ্ঞান মেলায় এসে নতুন নতুন আবিষ্কার সম্পর্কে জানতে পেরে সে আনন্দিত। তার মতে, এরকম আয়োজন শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু শেখার আগ্রহ বাড়ায়।

আনন্দ নিকেতন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী আয়েশাও বাবার সঙ্গে এসে মুগ্ধ হয়েছে নানা প্রযুক্তি দেখে।

এক অভিভাবক বলেন, শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে এমন আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে শিক্ষার্থীরা বইয়ের বাইরের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়।

Manual6 Ad Code

স্কুল ছুটির পর পুরো মেলাপ্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয় শিক্ষার্থীদের মিলনমেলায়। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন আর ভবিষ্যতের স্বপ্নে মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন।

১৫ মে শুরু হওয়া এই মেলা শেষ হয় ১৭ মে।