হাওর পাড়ে নিরব শিক্ষা বিপ্লবের হাতছানি, এলাকাব্যাপী আমূল পরিবর্তন

প্রকাশিত: 5:11 PM, January 2, 2017

আশিস রহমান, দোয়ারাবাজার
মুহিবুর রহমান মানিক সোনালি নূর উচ্চ বিদ্যালয়ের সংস্পর্শে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে বদলে গেছে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার হাওর পাড়ের সমগ্র চিত্র। কয়েক বছর আগেও স্কুল পড়ুয়া বয়সী যে শিশুদের হাতে দেখা যেতো মাছ ধরার জাল কিংবা যে পরিবারের গুলো তাদের শিশুদের প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরুবার আগেই কৃষিকাজ, মাছ ধরা, হাওরে গরু রাখার কাজে নিয়োজিত করতে বাধ্য করতো এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়েনা। যারা শিশুবয়সে গরু রাখতো, মাছ ধরতো, কৃষিকাজ করত এখন তাদেরকে বই হাতে স্কুলে যেতে দেখা যায় রীতিমতো। গ্রামের পরিবারগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়ে উঠেছে। পরিবারের অভিভাবকরা তাদের শিশুদের স্কুলে যেতে বাধ্য করছেন। পাল্টে গেছে পশ্চাদপৎ হাওরপাড়ের সামগ্রিক দৃশ্যপট। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলার হাওরপাড়ের প্রায় আট দশটি গ্রামের সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক ক্ষেত্রে এসেছে আমূল পরিবর্তন। বিদূরীভূত হয়েছে অন্ধ বিশ্বাস, হাজার বছরের কুসংস্কার, মামলা মুকদ্দমা কিংবা বউ পিটানোর রীতিনীতি। পরিবর্তনের ছোয়া লেগেছে সামাজিক আচার আচরণ, রীতিনীতিতেও। পরিবর্তন ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের কালনার হাওরের পূর্বপাড়ে আলীপুর গ্রামের নিকটবর্তী মুহিবুর রহমান মানিক সোনালি নূর উচ্চ বিদ্যালয়টি শিক্ষা বঞ্চিত পশ্চাদপৎ এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। ১৯৯৮ সালে এলাকার কিছু উদ্যোগী হাতে গোনা শিক্ষিত লোকদের প্রচেষ্টায় হাওরপাড়ে এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার দূরে উন্নয়ন বঞ্চিত দুর্গম এলাকায় গড়ে উঠা এ বিদ্যালয়টি আশপাশের একাধিক গ্রামের মধ্যবিত্ত ৮০ জন লোকের অনুদানের টাকায় কেনা পাচঁ একর ৮৩ শতক ভূমিতে প্রাথমিকভাবে শুরু হয় একাডেমিক কার্যক্রম। পরবর্তীতে অনুদানের টাকায় ১৭ কেদার ভূমিতে স্থানীয় লোকজনদের সেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে পুকুর খনন করে মৎস খামারের আয় থেকে বহন করা হয় শিক্ষকদের সম্মানী ভাতা। স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের একান্ত সহযোগিতায় ২০১০ সালে ৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় একাডেমিক ভবন। একই সালে সিলেট শিক্ষাবোর্ডের প্রাথমিক অনুমোদন পায় উক্ত প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বিদ্যালয়টির মূলভবনের পশ্চিম পাশে ১,২৬,০০,০০০ টাকা ব্যয়ে দুইতলা বিশিষ্ট বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র কাম বিদ্যালয় ভবন নির্মিত হয়। স্কুলের উত্তর দিকে ৮ কিলোমিটার, দক্ষিণে ৬ কিলোমিটার, পশ্চিমে ৭ কিলোমিটার, পূর্ব দিকের অন্তত সাড়ে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত কোনো বিদ্যালয় না থাকায় এসব এলাকার শিক্ষার্থীদের লেখা পড়ার বিকল্প কোনো প্রতিষ্ঠানও নেই। সঙ্গত কারনেই হাওরপাড়ের বিভিন্ন গ্রাম শিক্ষার দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে। এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠায় দুর্গম এলাকার কোমলমতি শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে বিলম্বে স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরে হলেও। বর্ষামৌসুমে ৭/৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিভিন্ন গ্রাম থেকে বৃষ্টি বাদল উপেক্ষা করে নৌকা যোগে বিদ্যালয়ে আসতে হয় শিক্ষার্থীদের। হেমন্তে চতুর্দিকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ঝুকিপূর্ন কাচাঁ রাস্তা ও খাল বিলের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পায়ে হেটে আসতে হয় এখানে। সামান্য বৃষ্টিপাতেই ছোট ছোট কাচাঁ রাস্তা গুলো হাঁটু সমান কাদায় পিচ্ছিল হয়ে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ে। একারণে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের অনেকেই বর্ষা মৌসুমে ঝড়ে পড়ে। বর্ষায় সোনাপুর, আলীপুর, নূরপুর, বড়কাটা, হাছনবাহার, সুলতান পুরসহ দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরা যাতে ঝড়ে না পড়ে সেজন্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সযাগ দৃষ্টি দেওয়া হয় পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের খরচেই প্রতি বর্ষায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোর শিক্ষার্থীদের নৌকায় করে বিদ্যালয়ে আনা নেয়া করা হয়। বর্ষা কালে বিদ্যালয়টিকে দ্বীপ সদৃশ মনে হয়। সরজমিনে গ্রাম থেকে বহুদূরে হাওরপাড়ের এ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের উৎসব মুখর পরিবেশে লেখাপড়ার দৃশ্য। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৮ জন শিক্ষক দশম শ্রেণী পর্যন্ত ৪০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। লেখা পড়ার মনোরম পরিবেশ দেখে মনে হয়না এটি দুর্গম এলাকার হাওরপাড়ের একটি বিদ্যানিকেতন। উত্তর দিকের টিন সেডের এবং পশ্চিম দিকের পাকা দ্বীতল একাডেমিক ভবন, মাঠের পাশে সবুজ ঘাস দূর থেকে মনে হয় যেন হাওরপাড়ের রাজপ্রাসাদই নয় বরং সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্রে অপার হাতছানি। স্কুলের সামনে বিশাল খেলার মাঠ আর লাল সবুজের পতাকা উড়ছে স্কুল আঙিনায়।বই খাতা সাথে টিফিন বাটি হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীদের ঘন কুয়াশা আর হাওরপাড়ের ছোট ছোট রাস্তা অতিক্রম করে স্কুলে আসতে দেখে মনভরে যায়। ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই কোমলমতি শিশুরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়। আশার কথা এই যে, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজোবধি জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছে। এবছরও জেএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ কৃত ৭০ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুইটি জিপিএ-৫ সহ ৬৯ জন শিক্ষার্থী কৃতিকার্য হয়। পর্যাপ্ত সু্যোগ সুবিধার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি শিক্ষক সংকট দূর করা গেলে আশাকরা যায় ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টি সাফল্যের আরো কয়েক দাপ অতিক্রম করবে। হাওরপাড়ের এ বিদ্যাপিঠটি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিলেও সমস্যার শেষ নেই এখানে। প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও আজোবধি বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তি হয়নি। অনেকটা বিনাপারিশ্রমিকেই পাঠদান স্থানীয় এবং বহিরাগত শিক্ষকরা। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত বেতন বাতা ও সুযোগ সুবিধা দেওয়া সংকুলান না হওয়ার ভালো শিক্ষক রাখা সম্ভব হচ্ছেনা বিধায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পরছে। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি বিদ্যালয়টিতে বিজ্ঞান বিভাগ নেই। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরা স্কুল বিমুখ হয়ে পরেছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, উন্নয়ন বঞ্চিত দুর্গম এলাকার এই প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তি সহ শিক্ষার্থীদের আসা যাওয়ার রাস্তা পাকা করণ, স্কুলটি রক্ষায় হাওরপাড়ের বেড়িবাঁধে স্লুইচগেইট নির্মাণ, বিভিন্ন গ্রাম থেকে সংযোগ সড়ক সংস্কার এবং নিকটবর্তী খাসিয়ামারা নদীতে ব্রিজ নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরী প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র মেহেদী হাসান জানায়, বিজ্ঞান বিভাগ এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় আমরা বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করতে পারছিনা। অন্যান্য স্কুলের তুলনায় আমরা অনেকটা পিছিয়ে পরছি। স্কুলের উদ্যোক্তা সদস্য স্থানীয় আলীপুর গ্রামের বাসিন্দা মুহম্মদ মশিউর রহমান বিএসসি জানান, বিদ্যালয় থেকে একাধিক গ্রামের সংযোগ সড়ক পাকা করণ, বেড়িবাঁধে স্লুইচগেইট নির্মাণ এবং নিকটবর্তী খাসিয়ামারা নদীতে ব্রীজ নির্মাণ করা অতি প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম জানান, আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকায় পর্যাপ্ত শিক্ষক রাখা সম্ভব হচ্ছেনা। বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে এমপিওভুক্তি করা প্রয়োজন। সহকারী শিক্ষক এনামুল হক বিএসসি জানান, স্কুল এমপিওভুক্তি না হওয়ায় পর্যাপ্ত বেতন ভাতা পাচ্ছিনা বিধায় পরিবারের ভরন পোষন চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এদিকে শিক্ষক সংকট থাকায় বাড়তি শিক্ষকের চাপ আমাদেরকে একাই মোকাবেলা করতে হচ্ছে। নূরপুর গ্রামের অভিভাবক আলীনূর মেম্ববার বলেন, বিদ্যালয়টির দক্ষিণ দিকের একমাত্র যাতায়াত সড়ক জোড়খলা আবোড়া বেড়িবাঁধে স্লুইচগেইট নির্মাণ এবং বিদ্যালয়টিকে এমপিওভুক্তি করা হলে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা আরো উৎসাহী হয়ে উঠবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ