চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ, লোডশেডিংয়ে নাকাল মানুষ

sylhetsurma.com
প্রকাশিত আগস্ট ১১, ২০২৬
চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ, লোডশেডিংয়ে নাকাল মানুষ

Manual1 Ad Code

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং ও বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার ভেলকিবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে দিরাই উপজেলার জনজীবন।

দিনের পাশাপাশি রাতেও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানি ওঠানোর মোটর চালানো যাচ্ছে না, দেখা দিয়েছে পানির সংকট। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজ ও ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষিত মাছ-মাংস, দুধ, আইসক্রিমসহ বিভিন্ন খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

Manual2 Ad Code

স্থানীয়দের অভিযোগ, কখন বিদ্যুৎ থাকবে আর কখন চলে যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিছুক্ষণ পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে একদিকে ঘুমের ব্যাঘাত, অন্যদিকে মশার উপদ্রব সব মিলিয়ে নাকাল হতে হচ্ছে মানুষকে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে দিরাইয়ের ব্যবসা-বাণিজ্যেও। দোকানপাট, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, মিষ্টির দোকান, ফার্মেসি, ফটোকপি ও কম্পিউটার ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানসহ বিদ্যুৎনির্ভর প্রায় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানের ফ্যান, লাইট, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফটোকপি মেশিনসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো যাচ্ছে না। এতে কাজের গতি কমে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকও ফিরে যাচ্ছেন।

Manual7 Ad Code

রেস্টুরেন্ট, হোটেল, মিষ্টির দোকান ও বিভিন্ন খাবারের ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ আরও বেশি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্রিজ ও ডিপ ফ্রিজ ঠিকমতো কাজ না করায় সংরক্ষিত খাবার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে ব্যবসায়ীদের একদিকে পণ্য নষ্ট হওয়ার ক্ষতি, অন্যদিকে বিক্রি কমে যাওয়ার ক্ষতি দুই দিকই সামলাতে হচ্ছে। ছোট ব্যবসায়ীদের অনেকেরই জেনারেটর, আইপিএস কিংবা ইনভার্টারের মতো বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যবহারের সামর্থ্য নেই।

বিদ্যুৎ না থাকায় পানি সংকটও তীব্র হচ্ছে। দিরাইয়ের অনেক বাসাবাড়িতে পানি ওঠানোর জন্য বৈদ্যুতিক মোটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে মোটর চালানো সম্ভব হয় না। ফলে রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া, অজু ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বাসিন্দাদের।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ধর্মীয় কার্যক্রমেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। স্থানীয় মুসল্লিদের অভিযোগ, প্রায় প্রতিটি ওয়াক্তের নামাজের সময়ই কোনো না কোনোভাবে বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমের মধ্যে মসজিদে নামাজ আদায় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে জোহর, আসর ও এশার সময় গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় নামাজ পড়া মুসল্লিদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বয়স্ক ও অসুস্থ মুসল্লিদের দুর্ভোগ আরও বেশি।

Manual2 Ad Code

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে। রাতের বেলায় বিদ্যুৎ চলে গেলে গরম ও অন্ধকারের কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনলাইন ক্লাস, কম্পিউটার ভিত্তিক পড়াশোনা কিংবা মোবাইল ল্যাপটপে শিক্ষামূলক কাজও ব্যাহত হচ্ছে। পরীক্ষার প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদ্যুৎনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট দীর্ঘ হলে রোগীসেবা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হয়। প্রচণ্ড গরমে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগও বেড়ে যায়।

বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও ক্ষতির মুখে পড়েছে। ওয়েল্ডিং, কাঠের কাজ, মেরামতকেন্দ্র, ধান চাল প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন কাজে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হওয়ায় বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন ও কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ।

লোডশেডিং মোকাবিলায় অনেক ব্যবসায়ী জেনারেটর, আইপিএস ও ইনভার্টার ব্যবহার করলেও এতে বাড়ছে বাড়তি খরচ। বড় ব্যবসায়ীরা কোনোভাবে বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে একদিকে ব্যবসা বন্ধ থাকছে, অন্যদিকে ব্যবসা চালু রাখতে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

এদিকে দিরাই বিদ্যুৎ সরবরাহের আবাসিক প্রকৌশলী পরশুরাম তরফদার বলেন, দিরাই পিডিবির বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৬ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহে প্রায় ২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। বরাদ্দের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিদ্যুৎ বিভাগের এই তথ্যেই দিরাইয়ের বর্তমান পরিস্থিতির চিত্র স্পষ্ট। প্রায় ৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সরবরাহ নিয়ে একটি উপজেলার স্বাভাবিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল রাখা কতটা কঠিন, তা ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দুর্ভোগেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ রয়েছে সেখানে আরো বেহাল দশা।

Manual6 Ad Code