সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডন ৫ দিনের রিমান্ডে

sylhetsurma.com
প্রকাশিত আগস্ট ২৭, ২০২৬
সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডন ৫ দিনের রিমান্ডে

Manual8 Ad Code

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিট ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এ আদেশ দেন।

প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই শাহ আলম এ তথ্য দিয়েছেন।

তিন কারণ দেখিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান ডনকে ৭ দিনের রিমান্ডে চেয়ে আবেদন করেন গেল ২০ অগাস্ট। আদালত আসামির উপস্থিতিতে শুনানির দিন রাখেন বৃহস্পতিবার।

শুনানিকালে ডনকে আদালতে হাজির করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুকী ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। ডনের পক্ষে ঢাকা বারের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ ও অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম রিমান্ড বাতিল করে জামিন প্রার্থনা করেন। প্রয়োজনে কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রার্থনা করেছিলেন তারা।

শুনানি নিয়ে আাদলত ডনের ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়।

রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনে তিন কারণ

রিমান্ডের জন্য আবেদনে তিন কারণ দেখিয়ে সিআইডি বলেছে, মামলার ঘটনা আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর। ভুক্তভোগী জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তার মা মামলার পর থেকে অর্থাৎ ১৯৯৬ সাল থেকে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করে আসছেন। নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে বিভিন্ন পত্রিকাসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৎপর রয়েছেন। এমতাবস্থায় সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ডনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

Manual5 Ad Code

রিমান্ড আবেদনের দ্বিতীয় কারণে ডনকে ‘অত্যন্ত সুকৌশলী ও ধূর্ত প্রকৃতির’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সিআইডি বলছে, তাকে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড়ভাবে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মামলার ঘটনায় জড়িত অপরাপর সহযোগী আসামিদের অবস্থান নির্ণয় করে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য ও নিবিড়ভাবে তদন্তের স্বার্থে পুলিশ রিমান্ডে এনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

তৃতীয় কারণ হিসেবে সিআইডির দাবি, ডনের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিভিন্ন কৌশলে, কী কারণে ও কার ইন্ধনে তিনি বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছিলন এ সংক্রান্ত তথ্য উদঘাটনসহ মামলার প্রকৃত রহস্য জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত ৯ অগাস্ট ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। এরপর তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ১২ অগাস্ট জামিন আবেদন করা হলেও আদালত তা নাকচ করে দেয়।

এদিকে চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে তার স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ৩০ অগাস্টের মধ্যে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

Manual5 Ad Code

সামিরা ছাড়াও মামলার অন্য আসামিরা হলেন- সামিরার মা লতিফা হক লিও, চলচ্চিত্রের খলনায়ক আশরাফুল হক ডন, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।

গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম মামলাটি করেন।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিত্রনায়ক সালমান শাহ (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে সে সময় তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।

Manual7 Ad Code

ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।

Manual2 Ad Code

তখন অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সিআইডি বলে, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেন।

কিন্তু সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত।

এর দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ অগাস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক। তাতেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।

কিন্তু সালমানের মা নীলা চৌধুরী মামলটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন।

১১ জনের নাম উল্লেখ করে নীলা চৌধুরী দাবি করেন, এরা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

মামলাটি এরপর তদন্ত করে র‌্যাব। তখন রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।

তখন তদন্তের দায়িত্বে আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

সেখানেও বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে এবং জব্দ আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি।

পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদনে বলে, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রী সামিরার কারণে মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় ‘অভিমানী’ সালমান আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

ওই প্রতিবেদনেও অসন্তুষ্টি জানিয়ে ছেলের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তা জানতে আরও তদন্ত চান নীলা চৌধুরী। এর মধ্যে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।

এরপর আবার সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।

এ বিষয়ে সালমানের বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়।

পিবিআই ২০২০ যখন এ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, ডন তখন বলেছিলেন, “আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। অবশেষে কলিজার বন্ধুকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হলাম।”

তিনি বলেছিলেন, “২৪টা বছর বুকের ভেতর বন্ধু হত্যার মিথ্যা অপবাদ নিয়ে আমাকে ঘুরতে হয়েছে। আমার যে ক্ষতি হয়েছে তার পূরণ কিছুতেই হবে না। আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম। সত্য কোনো দিন মিথ্যা হয় না। মিথ্যাকেও কোনো দিন জোর করে সত্যি বানানো যায় না।”

ওই বক্তব্য দেওয়ার ছয় বছর পর সালমান শাহ হত্যা মামলাতেই গ্রেপ্তার হলেন ডন।

এছাড়া এর আগে গত ২০ মে ‘হত্যার’ প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমানের দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২৪ মে দেহাবশেষ উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও আবার ময়নাতদন্ত করার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাদীপক্ষ লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আবেদনটি নথিভুক্ত করেন।

গত ২২ জুন সালমানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে কবর থেকে তার দেহাবশেষ উত্তোলন প্রক্রিয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়। সিলেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহা একটি অফিস আদেশ জারি করেন। ওই আদেশের অনুলিপি সম্প্রতি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হলে তা নথিভুক্ত করা হয়।