মৌলভীবাজারে এক বছরে ৫৮ খুন

প্রকাশিত: ৫:৫৬ অপরাহ্ন, জানুয়ারী ৬, ২০১৭

মৌলভীবাজারে এক বছরে ৫৮ খুন

স্টাফ রিপোর্টার, মৌলভীবাজার থেকে :::: গেল বছর এ জেলায় সংঘাত, সংঘর্ষ ও নানা ঘটনায় ঝরে গেল ৫৮ প্রাণ। এসব ঘটনার অন্তরালে ছিল পারিবারিক কলহ, পূর্বশত্রুতা ও সম্পত্তির দ্বন্দ্ব। গেল এক বছরে মৌলভীবাজার জেলায় খুন হয়েছেন ৫৮ জন। এর মধ্যে খুন হওয়া ৫৭ জনের পরিবার থানায় মামলা করেন। এর বাইরে সংঘটিত যে সকল খুনের ঘটনায় থানায় মামলা হয়নি এটা পুলিশের তালিকায় আসেনি। গেল বছর শেষের দিকে জেলাজুড়ে আলোচিত ছিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ৭ই ডিসেম্বরের জোড়া খুনের ঘটনা। সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে একই গ্রুপের প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন ছাত্রলীগ নেতা শাবাব ও কর্মী মাহি। ওই ঘটনায় খুন হওয়া ছাত্রলীগ কর্মী মাহির পরিবার মামলা না করায় এটাও পুলিশের তালিকায় আসেনি। তালিকাভুক্ত খুনগুলোর মধ্যে আলোচিত ছিল ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ আলী শাবাব ও নাহিদ আহমদ মাহিকে চুরিকাঘাতে হত্যা। ওই ঘটনার একমাস অতিবাহিত হলেও আজও মামলার প্রধান আসামিসহ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। নিহত পরিবারের অভিযোগ রহস্যজনক কারণে পুলিশ আসামিদের গ্রেফতার করছে না। হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে গত ২০শে ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের সচেতন নাগরিকদের ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ হলেও এপর্যন্ত প্রশাসনের কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। যার কারণে জেলাব্যাপী ওই খুনের ঘটনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে ৪ঠা জানুয়ারি এই মামলার ২নং আসামি আরাফাত রহমান আদালতে আত্মসমর্পণ করে। আদালত জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠায়। জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ২৭৯৯ বর্গকিলোমিটার জায়গার মধ্যে জানুয়ারিতে ৮, ফেব্রুয়ারিতে ৩, মার্চে ১,
এপ্রিলে ২, মেতে ৪, জুনে ৮, জুলাইতে ৫, আগস্টে ৫, সেপ্টেম্বরে ৪, অক্টোবরে ৩, নভেম্বরে ৬ ও ডিসেম্বর মাসে ৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। মহান স্বাধীনতার মাসেও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ছিল। এই মাসেই ৮টি খুনের ঘটনা সংঘটিত হয়। ৫৮টি খুনের ঘটনায় জেলাজুড়ে আলোচিত ছিল ৬ ডিসেম্বর বড়লেখা উপজেলায় দাম্পত্য কলহের জেরে স্বামী বিধূ ভূষণ দাস স্ত্রী স্মৃতি রাণী দাসকে দা দিয়ে গলাকেটে হত্যা করে। স্বামীকে পুলিশ গ্রেফতার করলে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার দায় স্বীকার করে। জুড়ী উপজেলায় অপমানের প্রতিশোধ নিতে ১৬ই ডিসেম্বর রিয়াজকে পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ ডোবায় পুঁতে রাখে আমীর আলী। ঘটনার তিন দিন পর রিয়াজের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামের শশুড় বাড়িতে ২৩ অক্টোবর রাতে ঘুমন্ত স্ত্রী নাছিমা বেগম (৩০) কে গলাকেটে হত্যা করে স্বামী রফিক মিয়া। এসময় রফিক মিয়ার ছুরিকাঘাতে শাশুড়ি সোনাজান বিবি (৫৫) শ্যালিকা নাজমা বেগম (১২) গুরুতর আহত হন। পরে ঘাতক রফিক মিয়াকে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয়। এছাড়া টিলাগাঁও ইউনিয়নের বাগৃহাল গ্রামের তৈমুছ আলী প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের মেয়েকে হত্যা করে। একই উপজেলায় পূর্ব কর্মধা গ্রামে ছেলের লাঠির আঘাতে বাবা ইসমাইল আলী (৬৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ই সেপ্টেম্বর সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। রাজনগর উপজেলায় টেংরা ইউনিয়নের কাছাড়ী করিমপুর গ্রামের হারুন মিয়ার মেয়ে ও তারাপাশা স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শাম্মি আখতারকে ১৮ই মে রাতে ডেকে নিয়ে গণধর্ষণের পর হত্যা করে বাড়ির অদূর জঙ্গলে লাশ ফেলে রাখা হয়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। 7ই ডিসেম্বর মৌলভীবাজার সদর , সইয়ারপুর এলাকার মৃত ইসকন্দর আলীর ছেলে ছাত্রলীগ নেতা সুমন আহমদ গুলি বিদ্ধ হয়ে মারা যান। উল্লেখ্য যে, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের ছাত্রী সামরিয়া খালিক তালুকদারকে ছাত্রলীগ নেতা আসাদ্জ্জুামান রনির ইভটিজিং করায় তারই ভাই আমিনুল ইসলাম তালুকদার রনির সাথে সংঘর্ষ বাধলে ঘটনা স্থলে গুলি বিদ্ধ হয়ে সুমন প্রাণ হারায়। শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও ইউনিয়নের আলিশারকুল এলাকায় ২১শে ডিসেম্বর ভাবি ছালেহা বেগমকে (৫৩) কুপিয়ে হত্যা করেছে দেবর নুর মিয়া। এ ঘটনায় দেবর নুর মিয়াকে আটক করে পুলিশ। কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের গুলের হাওর গ্রামের মুসলিম মনিপুরী সমপ্রদায়ের দরিদ্র কৃষক কায়াম উদ্দীনের মেয়ে রাবিনাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে ধর্ষণের পর ধলাই নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয় দুলাভাই দেলওয়ার। দেলওয়ারের বাড়ি আদমপুর ইউনিয়নের মাটিয়া মসজিদ এলাকায়। তবে এসব ঘটনা ঘটেছে হঠাৎ করে। পরিবার বা নিজেদের পরিচিতদের মধ্যে। আর এসকল খুনের অধিকাংশই ঘটেছে প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায়। এবিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহজালাল বলেন, সবসময়ই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখার চেষ্টা থাকে আমাদের। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকি। তবে কিছু কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনা আমাদের কর্মেও প্রভাবিত করে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে আমাদের মনুষ্যত্ববোধ ও মানবিকতা আরো জাগ্রত করার প্রয়োজন। শুধু পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয় রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণে সকলকে আরো সচেতন হওয়ার প্রয়োজন। ছাত্রলীগের দুই কর্মী খুনের ঘটনায় বলেন আমরা আসামিদের শনাক্ত করতে পেরেছি। খুনিরা আত্মগোপনে থাকায় গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •