এ কোন বার্তা রাজনীতির ময়দানে

প্রকাশিত: ২:০১ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৬, ২০১৮

এ কোন বার্তা রাজনীতির ময়দানে

আব্দুল হালিম :::::
গত ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের অধিকারের ওপর বাধা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। চলছে গুম, বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ধরপাকড়, মানবাধিকার কর্মীদের হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের মত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ২০১৭ সালের মানবাধিকার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে ওই রিপোর্টে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা বন্ধ হয়নি। ২০১৭ সালে কয়েকজন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। নিহত হন সমকাল-এর শাহজাদপুর প্রতিনিধি আবদুল হাকিম। স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারে অন্যায়ভাবে বাধা সৃষ্টি এবং সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের নিশানা বানানো ও হয়রানি করার লক্ষ্যে সরকার দমনমূলক আইনের প্রয়োগ করে যাচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি) নিপীড়নমূলক ধারা বাতিলে মানবাধিকার কর্মীরা বারবার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও শাস্তিমূলক বিধানগুলো অক্ষত রাখা হয়েছে। সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন চালুর যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তা অনলাইনে স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারে আরও বাধা সৃষ্টি করবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের অধিকার ভীষণভাবে সীমিত। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বৈঠক সমাবেশ আয়োজনের অধিকারে বাধা দেয়া হচ্ছে। বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রম) নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় সীমিত রাখা হচ্ছে বেসরকারি সংগঠনগুলোর (এনজিও) তৎপরতাও। অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুমের ঘটনা ঘটছে নিয়মিতভাবে। এর প্রধান শিকার হচ্ছেন বিরোধীদলীয় সমর্থকেরা। গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের কারও কারও লাশ মিলছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিচার বিভাগের ওপর ক্রমবর্ধমান সরকারি হস্তক্ষেপে উদ্বেগ বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে গত বছরের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা নিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, ওই রায়ের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করেন। এর ধারাবাহিকতায় নভেম্বরে এস কে সিনহা দেশ ছাড়েন এবং পরে পদত্যাগ করেন।
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে যে সব বক্তব্য ও অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তা কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য শোভন হতে পারে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে গণতান্ত্রিক চেতনা এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মাধ্যমে। তাই স্বাধীন বাংলাদেশে মত প্রকাশে বাধা, অবদমন, গুম ও বিচার বিভাগের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপ মেনে নেয়া যায় না। এসব ব্যাপারে সরকারেরও বক্তব্য থাকতে পারে। সে বক্তব্য প্রকাশ পেলে বিষয়গুলো জনগণের কাছে আরও স্পষ্ট হতে পারে। দেশের জনগণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়, চায় গণতান্ত্রিক অধিকার। এছাড়া ন্যায় ও সুশাসনও তাদের কাম্য। দেশের রাজনীতি এবং সরকারের কার্যক্রম সেই লক্ষ্যে পরিচালিত হলে সবার মঙ্গল।
কিন্তু সরকার যেন পথ হারিয়ে ফেলেছে, মঙ্গলের পথে চলতে চাইছে না। মঙ্গলের পথে চললে তো সুশাসনের বিষয়টি স্পষ্ট হতো, পরমত সহিষ্ণুতার বাতাবরণ সৃষ্টি হতো। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর আচরণে তেমন লক্ষণ নেই। অনেকের আচরণেই অবজ্ঞা, অহংকার ও চাতুর্যের আস্ফালন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব দেখে দেখে তিতবিরক্ত হয়ে উঠছে জনগণ। পত্রিকার শিরোনামেও আসছে অনেক ঘটনা।
‘বিএনপির কালো পতাকার জবাবে পুলিশের লাঠিপেটা’ শিরোনামটি যে কোনো নাগরিকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো পত্রিকায় মুদ্রিত খবরটিতে বলা হয়, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ঢাকায় বিএনপির ‘কালো পতাকা’ প্রদর্শনের কর্মসূচি প- করে দিয়েছে পুলিশ। এ সময় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের লক্ষ্য করে পুলিশ জলকামান থেকে রঙিন পানি ছোঁড়ে। দলের নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে থেকে অন্তত ৫৯ জনকে আটক করা হয়। ঘটনার সময় পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হন ৩০ নেতাকর্মী। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার পর যোগাযোগ করা হলে পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, আটক ৩২ জন পুরুষ ও ২৭ জন নারীর বিরুদ্ধে পল্টন থানায় মামলা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা ও অনুমতি ছাড়া কর্মসূচি পালনের অভিযোগ আনা হচ্ছে। এদিকে ঘটনার পর বিএনপির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ১৫০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশের লাঠিপেটায় বিএনপির অন্তত ২৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অথবা নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করতে চেয়েছিল বিএনপি। পুলিশ সমাবেশ করার অনুমতি না দেয়ার প্রতিবাদে দলটি প্রথমে ‘কালো পতাকা মিছিল’ কর্মসূচি দিয়েছিল। পরে ‘মিছিল’ বাদ দিয়ে শুধু কালো পতাকা প্রদর্শনের কর্মসূচি দেয়া হয়। কর্মসূচি উপলক্ষে নয়াপল্টনে দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে একটি প্যান্ডেল করা হয়েছিল। সেটিও পুলিশ ভেঙে দিয়েছে। পরে কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতেও বিএনপি নেতাকর্মীদের দাঁড়াতে দেয়নি পুলিশ। তাদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং বেদম লাঠিপেটা করা হয়। কারো কারো গলা চেপে ধরা হয়, টুঁটিও চেপে ধরা হয়। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, লাঠিপেটার সময় সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পরও সাংবাদিকদের মারধর করা হয়, করা হয় হেনস্তা।
প্রশ্ন জাগে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী দলের ন্যূনতম কর্মসূচি পালনের অধিকার কি নিষিদ্ধ করা হয়েছে? বিএনপি তো সমাবেশ করার অনুমতি পেল না। কালো পতাকা মিছিল করতে চেয়েছিল, কিন্তু সরকারের হাবভাব দেখে ‘মিছিল’ বাদ দিয়ে শুধু ‘কালো পতাকা প্রদর্শন’ কর্মসূচি দিয়েছিল। কিন্তু এমন নিরীহ কর্মসূচিও সহ্য হলো না সরকারের। তাহলে বিরোধীদল হিসেবে বিএনপির করণীয় কী? সরকার কি তা বাতলে দেবে? আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য অবশ্য এখন নানা রঙে-রসে ভরপুর। গণতন্ত্রসম্মত নিরীহ কর্মসূচি দিলে তারা বলেন, ওদের আন্দোলন করার মুরোদ নেই। আবার আন্দোলনের কর্মসূচি দিলে বলে, ওরা দেশে অশান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জঙ্গিবাদে মত্ত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতারা আসলে আছেন মহামৌজে। সরকারে থাকলে বোধহয় এমনই হয়। সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবার বিএনপির করণীয় বাতলে দিয়েছেন। তিনি বিএনপিকে বলেছেন, আপনারা যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেন; তাহলে ঘরে বসে করুন, অফিসে করুন, রাস্তায় কেন? প্রশ্ন জাগে, আওয়ামী লীগ কি কখনো ঘরে বসে, অফিসে বসে আন্দোলন করেছিল? বিরোধী দলের প্রতি এই যদি হয় সরকারের মানসিকতা, তাহলে বিএনপি তো এখন অফিস-টফিস বন্ধ করে রাজনীতিটা বাদ দিলেই পারে। কারণ ক্লাস না হলে স্কুল বন্ধ করে দেয়াই ভাল। এটাই হয়তো গণতন্ত্রের নতুন পাঠ!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •