নারীর পথচলায় প্রধান বাধা ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠী,
একজন নারীর কলমে

## হেলেনা বেগম ##
আমি একজন নারী। আমি একজন মা, কন্যা, বোন, কর্মী এবং নাগরিক। কিন্তু ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো আমাকে কেবল একজন নারী হিসেবেই দেখে এবং তারা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। তারা মনে করে আমার অস্তিত্ব একটি সমস্যা, আমার কণ্ঠস্বর ঝামেলা সৃষ্টি করে এবং আমার স্বাধীনতা সমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এই লেখাটি তাদের প্রতি আমার ‘না’ বলার একটি উপায়।
তারা সময়কে পিছিয়ে দিতে চায়। তারা নারীদের ঘরের ভেতরে আটকে রাখতে চায়। আমি কী শিখব, কোথায় কাজ করব, কী পোশাক পরব, রাত কয়টায় বাসায় ফিরবো, কীভাবে হাসব সবকিছুই তারা তাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তাদের চোখে, নিখুতঁ নারী হলো শান্ত, বাধ্য এবং অদৃশ্য। সে প্রশ্ন করে না, স্বপ্ন দেখে না বা নিজের পছন্দ মতো সিদ্ধান্ত নেয় না। তারা ধর্ম নিয়ে কথা বলে, কিন্তু ক্ষমতা দখলের জন্য একে ব্যবহার করে। কোরআনে বলা আছে “জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। এটি ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই নির্দেশ করে। কিন্তু এই গোষ্ঠীগুলো মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে নিরোৎসাহিত করে কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে বাধা হয়ে দাড়ায়। আমাদের নবী হযরত মোহাম্মদ স: এর স্ত্রী খাদিজা (রাঃ) ছিলেন একজন বুদ্ধিমতী ব্যবসায়ী এবং আয়েশা (রাঃ) নবী সম্পর্কে অনেক গল্প বলেছেন এবং তিনি যুদ্ধে লড়াই করেছেন। কিন্তু উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এই ইতিহাস ভুলে যেতে চায় কারণ একজন জ্ঞানী নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
তাদের প্রথম হাতিয়ার হলো পোশাক। তারা বলে “শরীর ঢেকে রাখো,” তারপর “ঘরের ভেতরে থাকো।” কোনো নারী যদি নিজের ইচ্ছায় হিজাব পরে, সেটা তার পছন্দ। কিন্তু কেউ যদি নারীদের বলে দেয় কী পরতে হবে, বাইরে বেরুলো তাদের হুমকি দেয়, বাড়িতে মারধর করে, বা গ্রাম্য সালিশে অপমান করে তাহলে সেটা আর ধর্ম থাকে না, সেটা হয়ে যায় সহিংসতা। কোরআনে বলা আছে, “ধর্মে কোনো বল প্রয়োগ নেই,” কিন্তু তারা এটা উপেক্ষা করে। তারা নারীদের ক্ষেত্রে শুধু শাস্তিই দেখে: চুল দেখানোর জন্য নারীদের মারধর করা, ভালোবাসার জন্য চাবুক মারা, মেয়েরা ধর্ষনের স্বীকার হলে উল্টো তাদেরকেই দোষারোপ করা হয় যে কেনো বাইরে বের হয়েছিলি। তাদের লক্ষ্য হলো নারীদের ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা।
নারীদের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করে তারা আমাদের মর্যাদা কেড়ে নেয়। আমরা ভোট দিতে পারি, কর দিতে পারি, একটি দেশ পরিচালনা করতে পারি কিন্তু আমাদের জামার হাতা কতটা লম্বা হবে, তা তারাই ঠিক করে দেয়। এটা কেমন সমাজ? তারা জানে যে নারীরা যদি শিক্ষিত হয়, চাকরি করে এবং প্রশ্ন তোলে, তবে তারা সবকিছুবদলে দিতে পারে। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীর শরীরকেই মুখ্য হিসেবে দেখা হয়। তাই তারা চায় নারীরা শুধু যৌনদাসী হয়ে থাকুক, সত্যিকারের মানষু হিসেবে নয়। তারা চায় নারীরা বিশ্বাস করুক যে তারা শুধু পুরুষদের সেবা করার জন্যই জন্মেছে। কিন্তু আমি এটা বিশ্বাস করি না।
একজন উদার চিন্তার মানুষ হিসেবে আমি সবসময়ই বাকস্বাধীনতা, সমতা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে ধর্ম নিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি। একজন নারী পুরুষের নিয়ন্ত্রণে চলবে, এটা মানতে রাজি নই। আমি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। আমি একজন নারী। আমি মানুষ। আমি স্বাধীন। এই সত্যগুলোর সামনে তোমাদের নিয়মকানুনের কোনো মূল্য নেই। আমি ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং সেইসব ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যারা ধর্ম ব্যবহার করে নারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।