• ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের গৌরবময় নেতৃত্ব ও জামায়াতের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র : মো: সহিদুল ইসলাম

sylhetsurma.com
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১৬, ২০২২
মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের গৌরবময় নেতৃত্ব ও জামায়াতের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র : মো: সহিদুল ইসলাম

Manual7 Ad Code

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জাতির বেঁচে থাকার সংগ্রাম, আত্মপরিচয় ও ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। পাকিস্তান নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রের অমানবিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির যে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
অন্যদিকে, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে যখন গোটা জাতি স্বাধীনতার জন্য রক্ত ঝরাতে প্রস্তুত, তখনই একদল ধর্মের নামে রাজনীতি করা গোষ্ঠী- জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হয়ে এই দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এদেশের জনগণ যেমন সংঘবদ্ধভাবে স্বাধীনতা অর্জনের পথে এগিয়ে যায়, তেমনি জামায়াত চেয়েছিল সেই স্বাধীনতাকে রুখে দিতে। শুধু যুদ্ধের সময় নয়, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও তারা বারবার দেশকে পেছনে টেনে ধরার ষড়যন্ত্র করে গেছে। আজও তারা নিজেদের রূপ পাল্টে, ছদ্মবেশে, দেশের ভিতরে ও বাইরে সক্রিয়ভাবে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ছাড়া অসম্পূর্ণ। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণা করে বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে। এরপর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টির বেশি আসনে জয়লাভ করে। এ বিজয় নিশ্চিত করেছিল যে, বাঙালি জাতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরেও স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে সরে আসেনি। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী, বিশেষত ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো, বাঙালিদের এই গণরায়কে মেনে নেয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে চালানো হয় ভয়াল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। ঢাকাসহ দেশজুড়ে শুরু হয় গণহত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রদের হত্যা ইত্যাদি ভয়াবহ অত্যাচার।
বঙ্গবন্ধুকে সেদিন রাতেই গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তার আগেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গিয়েছিলেন। তারই ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সারির নেতারা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে গঠন করেন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রশাসন, মুজিবনগর সরকার। প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দিন আহমেদ, উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচএম কামরুজ্জামান- সকলেই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ও আওয়ামী লীগের প্রথম সারির সংগঠক।
মুজিবনগর সরকার থেকে শুরু করে পুরো যুদ্ধকালীন সময় আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক সব দায়িত্ব সফলভাবে পালন করে। তারা ভারতের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা করে, বিদেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। সর্বোপরি একটি সমন্বিত যুদ্ধ পরিচালনার কাঠামো তৈরি করে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় জামায়াতে ইসলাম। তারা শুধুমাত্র রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করেনি, বরং যুদ্ধকালীন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বাহিনী- রাজাকার, আলবদর, ও আলশামস- এর প্রতিষ্ঠাতা ও নেতৃত্বদানকারী সংগঠন হিসেবে কাজ করেছে। জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যরা সরাসরি আলবদর বাহিনীতে যোগ দেয় এবং মুক্তিযোদ্ধা, হিন্দু সম্প্রদায়, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করে।
বিশেষভাবে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের কথা স্মরণ করলে যে কেউ শিউরে উঠবে। সেদিন পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, চিকিৎসকসহ বহু বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ কাজের পেছনে ছিল জামায়াতের চরমপন্থী মনোভাব ও পাকিস্তানপন্থী অবস্থান। তারা চেয়েছিল, একটি স্বাধীন বাংলাদেশ যেন চিন্তা-চেতনায় নেতৃত্বশূন্য হয়ে জন্ম নেয়।
যুদ্ধের পর জামায়াতে ইসলামকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যুদ্ধাপরাধী অনেকেই দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে আবারও ঘৃণ্য পাকিস্তানপন্থী চক্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সামরিক শাসনের আবরণে একে একে ক্ষমতায় আসে জিয়াউর রহমান, এরশাদসহ নানা স্বৈরশাসক। তারা জামায়াতের পুনরাবির্ভাবের পথ সুগম করে। জামায়াতকে আবার বৈধ রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়। তারা সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়, জোট গঠন করে, এমনকি ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করে মন্ত্রীসভায়ও প্রবেশ করে।
এই সময়টিতেই জামায়াত রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের লোক বসিয়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা ব্যবস্থা- সবখানেই প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। তারা ইতিহাস বিকৃত করে পাঠ্যপুস্তকে নিজেদের অবস্থানকে বৈধ করার চেষ্টা করে। এমনকি এক পর্যায়ে তারা দাবি তোলে, “জামায়াত কোনোদিনই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেনি”- যা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে এবং ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে। এর মাধ্যমে জামায়াত চরম সংকটে পড়ে। তাদের শীর্ষ নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, দেলোয়ার হোসেন সাঈদীসহ অনেকেই গ্রেপ্তার হন ও বিচারের মুখোমুখি হন। বেশ কয়েকজনের ফাঁসি কার্যকর হয়। ফলে জামায়াতের সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। জামায়াতে ইসলাম এখন আর খোলাখুলি রাজনীতির ময়দানে নেই বটে, কিন্তু তারা ছদ্মবেশে নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। কখনও ইসলামিক মূল্যবোধের নামে “নতুন রাজনৈতিক দল” গড়ে তোলে, কখনও এনজিও বা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছায়ায় নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করে। তারা বিশেষ করে তরুণদের টার্গেট করে। ইউটিউব, ফেসবুক, টেলিগ্রাম- এইসব মাধ্যমে তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের শহীদ বানানোর অপচেষ্টা চালায়। তারা দেশের ইতিহাসকে মিথ্যা রূপ দিয়ে উপস্থাপন করে, যাতে নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়।
একইসাথে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশে পালিয়ে থাকা জামায়াতপন্থীরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে “রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন” বলে চিহ্নিত করতে চায়। তারা পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপ-আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
জামায়াতের ষড়যন্ত্র এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা দেশের ভেতর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া- এসব ঘটনার পেছনে থেকে উত্তেজনা ছড়ায়। তাদের উদ্দেশ্য হলো দেশে অস্থিরতা তৈরি করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা এবং একটি অকার্যকর রাষ্ট্র গড়ে তোলা। তারা চায় বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র না হয়ে একটি ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হোক।
আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নের যে পথে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই গতিকে থামাতে জামায়াত তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে। তারা জানে-একটি শিক্ষিত, সচেতন, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ কখনোই জামায়াতের মতো সাম্প্রদায়িক ও দেশবিরোধী শক্তিকে গ্রহণ করবে না। তাই তারা বিভাজনের রাজনীতি করে, ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে এবং ‘ইসলামের হেফাজতের’ নামে আসলে দেশের ভিতরে বিষবাষ্প ছড়ায়।
এই অবস্থায় আমাদের করণীয় একটাই- ইতিহাসের সত্যকে বারবার তুলে ধরা। নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে কিভাবে আওয়ামী লীগ এদেশকে স্বাধীন করেছে, আর জামায়াতে ইসলাম তার বিরোধিতা করে ইতিহাসের কালিমাপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছে। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা- এসব শব্দ যেন শুধু বইয়ের পাতায় না থাকে, বরং আমাদের প্রতিদিনের চেতনায় বেঁচে থাকে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “এদেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসতে শিখুন, তাহলেই ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া যাবে।” সেই মাটির টানে, সেই মানুষের জন্য, আমাদের শপথ হোক- আমরা জামায়াতের মতো দেশবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র সফল হতে দেব না। গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, সামনে যাবে, চিরকাল যাবে।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

Manual8 Ad Code

লেখক :
আহবায়ক : বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
জাউয়াবাজার ইউনিয়ন শাখা, ছাতক, সুনামগঞ্জ।

Manual2 Ad Code